শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়ামঃকান্তিচন্দ্র ঘোষ ও নজরুল ―রায়ান নূর

রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়ামঃকান্তিচন্দ্র ঘোষ ও  কাজী নজরুল ইসলাম                         
                                     রায়ান নূর

ওমর খৈয়াম বর্তমানে জগদ্বিখ্যাত কিংবদন্তী ৷ তিনি তার বিজ্ঞানের খোলস ছেড়ে কবে দার্শনিকতার স্তরে উপনীত হয়েছেন আর সীমাহীন প্রশ্ন জিজ্ঞাসায় রচনা করেছেন অমৃতসূধাস্বরূপ রুবাইয়াৎ যার অস্তিত্বে এখনো পন্ডিতগণ একমত হননি ৷ তার দর্শন উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে কালান্তরে;তার লক্ষণ মেলে আল্লামা ইকবালের পঙ্কতি ও তার‘আসরারে খুদী’তে ৷ যেমনঃ

এক তু হ্যায় কে হক হ্যায় ইস জাহাঁ মেঁ
                           বাকী হ্যায় নমুদ সিমিয়াই ৷
(এ দুনিয়ায়, হে মানুষ তুমিই একমাত্র সত্য,বাকী সবই মরীচিকা ৷)

তিনি যে রুবাইয়াৎ(চতুষ্পদী কবিতা) লিখেছিলেন তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে যখন এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড 110 টি রুবাইয়াতের ইংরেজী অনুবাদ করে গোটা ইউরোপকে তাক লাগিয়ে দেন ৷ যদিও রুবাইয়াতের সংখ্যা আরো অধিক পরিমাণে ছিল ৷ এরপর বহুভাষায় এমনকি বাংলাভাষায় এই রুবাইয়াতগুলোর অনুবাদ হয়েছে ৷ অনেক রুবাইয়াৎ পাওয়া গেছে খৈয়ামের নামে তা থেকে 66 টি রুবাইয়াত  প্রশ্নাতীতভাবে খৈয়ামেরই হতে পারে তা পন্ডিতগণ স্বীকার করেছেন ৷ বলাবাহুল্য ফিটজেরাল্ড সম্পূর্ণ নির্মোহ থেকে তার অনুবাদ সম্পন্ন করতে পারেন নি,এতে তাঁর অদম্য কবিত্বপ্রতিভার আঁচ লেগেছে যার ফলস্বরূপ অনেক ক্ষেত্রে অনুবাদগুলো মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে ভাব,ভাষাভঙ্গী কিংবা ছন্দের দিক থেকে ৷ তবু তার দর্শনের ছোয়া রুবাইয়াতগুলোকে নিরাসক্তভাবে ঐক্য সাধন করেছে ৷

বাংলাভাষায় ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ,কাজী নজরুল ইসলাম,কান্তিচন্দ্র ঘোষ,নরেন্দ্র দেব সহ অনেকেই অনুবাদ করেছেন ৷ তার মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম,নরেন্দ্র দেব ও কান্তিচন্দ্র ঘোষের অনুবাদ বিশেষ প্রণিধানযোগ্য ৷ কান্তিচন্দ্র তার অনুবাদকে সাবলীল ও হৃদয়গ্রাহী করার প্রয়াসে খৈয়ামের ফার্সী ছন্দ ব্যতিরেকেই  ফিটজেরাল্ডকেই অনুসরণ করেছেন যা মাত্রারিক্তভাবে নরেন্দ্র দেব, সিকান্দার আবু জাফরের অনুবাদেও লক্ষ করা যায় ৷ খৈয়ামের রুবাইয়াতের ভাষা,প্রকাশভঙ্গি ছিল অত্যন্ত সরল ও নৈসর্গিক ৷ অদৃষ্টের প্রতি নিরাসক্তি,স্বর্গের প্রতি অনাস্থা,ভবিষতের প্রতি অনীহা,অতীতের মোহ-ত্যাগ,প্রভুর নির্বিকার অবিচার, মৃত্যুর প্রতি চিরবিশ্বাস আর সামগ্রিকভাবে বর্তমানকে উদযাপনই ছিল তার রুবাইয়াতের প্রাণশক্তি ৷ তাই তার অনুবাদগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তিবিশেষে স্থান করে নিয়ে বিশেষ থেকে সামান্যে প্রত্যাবর্তন করেছে বিভিন্ন রূপ আর আঙ্গিকে ৷ কোন কবিই পারে নি তাকে নিয়মের ছকে বাধতে বরং অন্তর্নিঃসৃত বাণী ভাস্বর হয়েছে সকল অনুবাদে ৷  

খৈয়ামের অনুবাদ হয়েছে তিন শ্রেনীতে প্রথমত ভাবমুখ্য, দ্বিতীয়ত গতিমূখ্য,তৃতীয়ত ভাব-গতি মূখ্য ৷ কাজী নজরুল ইসলাম ও কান্তি ঘোষের অনুবাদে তৃতীয় লক্ষণটি স্বরূপে বিরাজমান ৷ কাজী নজরুল ব্যতিত এই অনুবাদকগণ ফার্সী ভাষা জানতেন কিনা তা সহজে বোধগম্য নয় ৷ যদিও জেনে থাকতে পারেন তবে বলতে হয় ইংরেজ কবি ফিটজেরাল্ডের মোহ তারা পূর্ণরুপে কেটে উঠতে পারেন নি ৷ কান্তিচন্দ্র ঘোষের অনুবাদের বিশেষত্ব এইযে,ভাষার সরলতা,একটি বিশেষ ছন্দের বহুল ব্যবহার,শব্দচয়নে নৈপন্য,ভাবের একত্রিকরণ ৷ আর এসব কারনে কান্তিচন্দ্রের অনুবাদ সাধারনের কাছে গ্রহণযোগ্য ৷ বলা হয়ে থাকে "কান্তিচন্দ্র ঘোষ ফিটজেরাল্ডের 110 টি রুবাই-এর মধ্যে 76 টি রুবাই-এর হুবহু অনুবাদ করে গেছেন ৷"¹কিন্তু তার অনুবাদগুলোতে স্বাতন্ত্র্যতা লক্ষ্য করা যায় ৷যেমনঃ 

'Tis all a Chequer-board of Nights and Days
Where Destiny with Men for Pieces plays:
Hither and thither moves, and mates, and slays,
And one by one back in the Closet lays.

কান্তি ঘোষের অনুবাদঃ

ছকটি আঁকা সৃজন ঘরের
রাত্রী দিবা দুই রঙের,
নিয়ৎ দেবী খেলছে পাশা
মানুষ ঘুঁটি সব ঢঙের;
প'ড়ছে পাশা ধ'রছে পুনঃ,
কাটছে ঘুঁটি, উঠছে ফের—
বাক্সবন্দী সব পুনরায়,
সাঙ্গ হ'লে খেলার জের ৷

সিকান্দার আবু জাফরের অনুবাদঃ

দিন-রাত্রীর রঙ দিয়ে আঁকা দাবার ছকটি মেলে
নসীব খেলছে বিচিত্র খেলা মানুষের ঘুঁটি চেলে;
ঘর থেকে ঘরে চালে চালে ঘুঁটি পড়ছে মরছে আর
দান শেষ হলে আবার তাদের বাক্সে রাখছে ঢেলে ৷৷

যেখানে মূল ফার্সীঃ

মা ল'বতেগানীম ও ফলকে ল'বতেবায
আয রুয় হাকিকাতি নাহ্ আয রুয় মজায
এক চান্দ দর ইন বেসাত বাজী কারদিম
রফতিম বেহ সন্দুকে আদম এক এক বায ৷

(আমরা খেলনা আর আসমান খেলোয়ার—বাস্তবে দেখ কল্পনায় নয় ৷কিছুটা সময় এর মধ্যে দেওয়া-নেওয়ার খেলা করে—সিন্দুকে মানুষকে একে একে পুরে রাখে ৷) 

কাজী নজরুলের অনুবাদঃ

আমরা দাবার খেলার ঘুঁটি, নাইরে এতে সন্দ নাই!
আসমানী সেই রাজ-দাবাড়ে চালায় যেমন চলছি তাই ৷
এই জীবনের দাবার ছকে সামনে পিছে ছুটছি সব
খেলা শেষে তুলে মোদের রাখবে মৃত্যু-বাক্সে ভাই!

অনুবাদগুলো পর্যালোচনা করলে ফিটজেরাল্ডের অনুবাদের অতিরঞ্জিত কবি প্রতিভার লক্ষণ পাওয়া যায় ৷ আর বাংলা অনুবাদে তার আরেক রূপ পরিলক্ষিত হয় ৷ কান্তিচন্দ্র ঘোষ ফিটজেরাল্ডের সবটুকুই নিয়েছেন সিকান্দার আবু জাফরের মত তবু কবি কল্পনায় বিস্তর ফারাক ৷ কান্তিচন্দ্র ঘোষ ভাবকে সমান্তরালভাবে একীভূত করবার প্রয়াসে অত্যন্ত সচেতন ভাবে শব্দের ঘুঁটি চেলেছেন—আবদ্ধ করেছেন এক নিপুন ছন্দে যা খৈয়ামের কবিতার মূল ভাব সাধারনের বুঝতেও দেরী হয় না ৷ নরেন্দ্র দেবের অনুবাদে বিচিত্র ছন্দের প্রভাবে শ্রুতিজনিত সমস্যা কিছুটা উপলব্ধি হয় আর রুবাই এর অস্বাভাবিক আকার বৃদ্ধি অনেককেই তুষ্ট করতে পারে নি ৷ অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলামের রুবাইয়াত আরবী ঘোড়ার তেজে চলেছে নিখূঁত ছন্দে কেননা ফার্সী ভাষা আয়ত্তে থাকার ফলে মূলভাব তার আত্নগত ছিল ৷ তবুও তার অনুবাদ পূর্ণ আক্ষরিক না হয়ে বরং কবিকল্পনামিশ্রিত ভাবানুবাদ হয়েছে ৷ অনুবাদ যাই হোক না কেন মূলভাব সকলেই আত্মগত করার চেষ্ঠা করেছেন ৷ ভাব ঠিক করতে ছন্দ পরিবর্তন কিংবা ছন্দ ঠিক করতে ভাবের পরিবর্তন সর্বোপরি ৷ এক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলাম ব্যতিত ভাব, ভাষা কিংবা শব্দ ব্যবহার ও ছন্দের নৈপন্যে কান্তিচন্দ্র ঘোষ বিশেষত্বের দাবীদার ৷

রুবাইয়াতের পূর্ণ অর্থ অনেক অনুবাদে অনুপস্থিত ৷ ফিটজেরাল্ড কখনো রুবাই-এর দুই-এক চরণ নিয়েই একটি রুবাইয়াত করেছেন এবং অনেক সংস্করণে রুবাইয়াতগুলোকে পরিবর্তিত করেছেন ৷ বাংলায় অনুবাদকগণও তাদের অনুবাদে ব্যতিক্রম করেননি ৷ কেবল কাজী নজরুল ফিটজেরাল্ডকে অনুসরণ করেন নি তবুও তার অনুবাদে মূল ভাবার্থের সঙ্গে অসঙ্গতি,বিচ্যুতি ঘটেছে কবি-প্রতিভার দরুন ৷ সকলেই খৈয়ামের মর্মে প্রবেশ করতে চেয়েছেন ও বক্তব্যের রহস্যজালে বারংবার ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন ৷ কাজী নজরুল যেমন একাত্ম হতে চেয়েছেন তার মূল স্পর্শ করে তেমনি কান্তি ঘোষ একাত্ম হতে চেয়েছেন তার ভাবের মধ্যে ৷ তাই অনুবাদগুলো দুই মেরুতে অবস্থান করছে ভিন্নরুপে ৷ এটি মূলের সাথে সম্পর্কভিন্ন পূর্ণ আক্ষরিক না হয়ে অনুবাদকের মৌলিক রচনায় স্নানান্তরিত হয়েছে ৷  যেমনঃ
   
“How sweet is mortal Sovranty!”—think some: 
Others—”How blest the Paradise to come!”    Ah, take the Cash in hand and waive the Rest; 
Oh, the brave Music of a distant Drum!

কান্তি ঘোষের অনুবাদঃ

রাজ্যসুখের আশায় বৃথা
কেওবা কাটায় বরষা মাস;
স্বর্গসুখের কল্পনাতে
পড়ছে কারুর দীর্ঘশ্বাস ৷
নগদ যা’পাও হাত পেতে নাও,
বাকীর খাতায় শূন্য থাক্ ―
দূরের বাদ্য লাভ কি শুনে? ―
মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক ৷ 

যেখানে নজরুলের অনুবাদঃ

করছে ওরা প্রচার―পাবি স্বর্গে গিয়ে হুর পরী,
অামার স্বর্গ এই মদিরা,হাতের  কাছের সুন্দরী৷
নগদা যা পা’স তাই ধরে থাক,ধারের পণ্য করিসনে,
দূরের বাদ্য মধুর শোনায় শুন্য হাওয়ায় সঞ্চরী ৷

মূল ফার্সীঃ

গবিন্দ কসান ভেস্ত্ বা হুর খোশ আস্ত
মান মেগবিম কেহ আবে আঙ্গুর খোশ আস্ত
ইন নক্বদে বগীর ও দস্তে আয আন নসিয়েহ বেদার
কাওয়াজ দহলে শানিদনে আয দুর খোশ আস্ত ৷

(সকলে বলে বেহেস্তের আনন্দ হুরপরীতে―আমি বলি আমার আনন্দ দ্রাক্ষারসে ৷ বাকী মুল্যের জন্য নগদ হাতছাড়া কর না―দূরের খুশির বাদ্য তীব্রই শোনায়)   
 
অনুবাদগুলো বিচার করলে নজরুল ও কান্তি ঘোষের অগাধ প্রতিভা ও  কবিত্বশক্তির পরিচয় পাওয়া যায় ৷ যেখানে ভাষা মূখ্য নয় ভাব মূখ্য ৷ মূল থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হলেও কান্তি ঘোষ তার অনুভূতি থেকে বিচ্যুত হননি ৷ এখানে যেন খৈয়ামের বাক্য প্রধান নয়, প্রধান তার অন্তর্নিহিত দর্শন ৷ এই দ্বন্দ্ব থেকে ফিটজেরাল্ডও মুক্তি পান নি ৷ দ্রাক্ষারসে খৈয়াম জারিত হয়েছেন তিলে তিলে আর বর্তমানকে আঁকড়ে ধরে দূরের স্বর্গমোহ ত্যাগ করেছেন তেমনি খৈয়ামকে আঁকড়ে ধরে কবিগনও যেন তার ভাবসমুদ্রে অন্তঃর্লীন হয়েছেন ৷  

কান্তি ঘোষের অনুবাদে ফার্সী শব্দের যথাসামান্য ব্যবহার আছে যেমন প্রয়োজনের তাগিদে তেমনি নিয়ৎ দেবী,দেব,দেবতা,যুক্তিদেবী,ভাগ্যদেবী,ভাগ্যসুতো,পুজো,মাঙ্গলিক,দৈববাণী,নমস্কার,আশীষ,পঞ্চভূত,বিশ্বরথ,বিধানরথ,স্বর্গদূতী,মন্দির,উপোস,দ্রাক্ষাদেবী,দ্রাক্ষাবঁধু,তৃণাসন,চরকাসুতো,দিব্যি ইত্যাদি শব্দগুলি অধিকতর পরিভাষিক শব্দ হিসেবে বেছে নিয়েছেন ৷ অন্যদিকে কাজী নজরুলের অনুবাদে যথাযথ ফার্সী শব্দের বহুল ব্যবহার অাছে  পরিভাষিক শব্দের তুলনায় ৷ ভাগ্যলক্ষ্মী,স্বর্গদূত, দেবী-প্রতিমা,প্রভু ইত্যাদি কতিপয় পারিভাষিক শব্দ ব্যতিত ফার্সী মুসলমানি শব্দের অবাধ ছড়াছড়ি তার অনুবাদে ৷ কাজী নজরুল ইসলাম তার অনুবাদে কককক/ককখক মূল ছন্দরীতি অনুসরণ করেছেন আর কান্তি ঘোষ মূল ছন্দ ব্যতিরেকে স্বরবৃত্ত ছন্দ ককখখ অন্ত্যমিলে রুবাইয়াতগুলোকে কাঠামোতে আবদ্ধ করেছেন ৷ যেমনঃ

কান্তি ঘোষঃ

সেই নিরালায় পাতায় ঘেরা
     বনের ধারে শীতল ছায়,
খাদ্য কিছু,পেয়ালা হাতে
      ছন্দ গেঁথে দিনটা যায়!
মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে
            গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর ―
সেই তো সখি স্বপ্ন আমার,
               সেই বনানী স্বর্গপুর!

কাজী নজরুল ইসলামঃ

এক সুরাহী সুরা দিও,একটু রুটি ছিলকে আর
প্রিয় সাকী,তাহার সাথে একখানা বই কবিতার,
জীর্ণ আমার জীবন জুড়ে রইবে প্রিয়া আমার সাথ,
এই যদি পাই চাইব না কো তখৎ আমি শাহানশার!

খৈয়ামের ফার্সী রুবাইয়াতের অনুবাদগুলো বাংলায় অবিকল বিষয়বস্তুতে  আসেনি ৷ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বক্তব্য হল ফার্সী থেকে অনুবাদ আর ইংরেজী থেকে অনুবাদ;এই দুই শ্রেণি সম্পর্ণ আলাদা ৷ তাই কাজী নজরুলের সাথে কান্তি ঘোষের অনুবাদ যেমন স্বতন্ত্র তেমনি ফিটজেরাল্ডের অনুবাদ আর কান্তি ঘোষের মধ্যে অমিল এবং কাজী নজরুল আর ফার্সী রুবাইয়াতের মধ্যে অমিল দৃষ্টিসাপেক্ষ ৷ 
কান্তি ঘোষের অনুবাদ মূলের সাথে আংশিক সঙ্গতিপূর্ণ তাই তা মৌলিক রচনারই নামান্তর ৷ কেননা তিনি ফিটজেরাল্ডকেও পূর্ণভাবে অনুকরণ করেন নি ৷ কাজী নজরুল ও কান্তি ঘোষের মধ্যে উপরোল্লিখিত মিল বিদ্যমান থাকলেও কান্তি ঘোষের মূলের সাথে ভাবের বিচরণ বিচ্ছিন্ন এবং তাতে খৈয়ামের দর্শন ও রসপ্রাপ্তি ঘটে কিন্তু পাঠকের মনে সংশয়ের উদ্রেক করে ৷ কান্তি ঘোষের অনুবাদ ‘এর জিনিসটা বস্তু নয়,গতি’―রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উক্তিটিই বিশ্লেষণসাপেক্ষ ৷ মৌলিক রচনা হিসেবে কান্তি ঘোষের অনুবাদ বিশেষ কৃতিত্বের দাবীদার এবং খৈয়াম দর্শন বিশেষভাবে উপলব্ধির কারণে তার অনুবাদ মূল ব্যতিরেকেই বাংলায় রুবাইয়াত ই ওমর খৈয়াম হিসেবেই পরিগনিত হবে লোকদৃষ্টির অন্তরালে ৷

রবিবার, ১০ আগস্ট, ২০১৪

ওমর খৈয়াম— রায়ান নূর

ওমর খৈয়াম
           রায়ান নূর

ওমর খৈয়াম,তার পূর্ণ নাম গিয়াস উদ্দীন আবু আল-ফতেহ ওমর ইবনে ইব্রাহীম আল-নিশাপুরী আল-খাইয়ামী ৷ (জন্ম 18 ই মে 1048,নিশাপুর,খোরাসান ৷ মৃত্যু 4ই ডিসেম্বর 1131,নিশাপুর)

পারস্যিক গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং কবি ৷ সমসাময়িককালে নিজ দেশে তার বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞার জন্য তিনি প্রখ্যাত ছিলেন কিন্তু ইংরেজ লেখক এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড অনূদিত "রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম(1859)" প্রকাশের পর তিনি ইংরেজ ভাষাভাষীদের কাছে প্রধানত পরিচিতি লাভ করেন তার রুবাইয়াৎ(চতুষ্পদী কবিতা) সংকলনের মাধ্যমে ৷

তার নাম খৈয়াম(তাবুকার) তার পিতার বৃত্তি বা পেশাসুত্রে এসেছে অনুমিত হয় ৷  তিনি সমরখন্দ(উজবেকিস্তান ) গমনের পূর্বেই নিশাপুরেই বিজ্ঞান ও দর্শনে সম্যক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন ৷ সমরখন্দে তিনি বীজগণিতের উপর  "রিসালাহ ফিল-বারাহিন আল-মাসাইল আল-জেবরা ওয়াল-মুকাবিলাহ(বীজগনিতের সমস্যার প্রতিপাদন সূত্র) পুস্তক রচনা সম্পন্ন করেন যা গণিতে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণস্বরূপ ৷এই পুস্তকে তিনি ত্রিঘাত সমীকরণকে মোচাকৃতিবর্গে ছেদন প্রক্রিয়ায় সমাধানে পর্যায়ক্রমিক বর্ণনা দিয়েছেন ৷ প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল তার কাজের পূর্বসূত্র যা তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় আবু আল-ওয়াফার ফলাফল ত্রিমাত্রিক ও চতুর্মাত্রিক মূল সংখ্যাকে ভেঙে নয়মাত্রার বিচ্ছিন্ন সংখ্যার উপর প্রতিস্থাপনের উপর ভিত্তি করে মৌলিক পুরো সংখ্যা পেতে ৷

তিনি এমন খ্যাতি পেয়েছিলেন যে সেলযুক সুলতান মালিক শাহ বর্ষপুঞ্জি প্রণয়নের প্রয়োজনে তার জ্যোতির্বিদ্যাজাত দুরদর্শিতা পরখ করতে তাকে ইস্পাহানে অামন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ৷ সেখানে একটি মানমন্দির তৈরি করা হয় এ কাজ সম্পন্ন করতে এবং "জালালী বর্ষপঞ্জি" নামে নতুন একটি বর্ষপঞ্জি তৈরি হয় প্রত্যেক 33 বছরে 8 বছর অধিবর্ষের ভিত্তিতে ৷ এটি বর্তমান গ্রিগোরিয়ান বর্ষপঞ্জির তুলনায় তখন অনেক সঠিক ছিল এবং 1075 খ্রীঃ মালিক শাহ কর্তৃক গৃহীত হয় ৷এছাড়াও ইস্পাহানে তিনি ইউক্লীডিয় সমান্তরাল ও সমানুপাতিক স্বীকার্যের উপর গঠনমূলক সমালোচনা লিপিবদ্ধ করেন ৷ সেই সূত্রে তৎকালিন তার ধারণা  অবশেষে ইউরোপে নতুনমাত্রা তৈরি করেছিল যেখানে তারা ইংরেজ গণিতবিদ জন ওয়ালিসের(1616-1703) উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং পরবর্তীতে তিনি  বিস্তারানুপাত যুক্ত করে সংখ্যার ধারণাকে  সমৃদ্ধ করার জন্য মূল্যবান যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন( যেমন অমূলদ সংখ্যা√2 এবং π) ৷

তার সময়ে ইস্পাহান নগরী অনেক সমৃদ্ধ ছিল কিন্তু 1092 খ্রীঃ তার পৃষ্ঠপোষক সুলতানের মৃত্যুর পর বিধবা পত্নী তার উপর ক্রোধান্বিত হন এবং  তার অল্পকাল পরেই ওমর মক্কায় পবিত্র হজ্ব পালন করতে যান ৷ তারপর তিনি নিশাপুরে প্রত্যাবর্তন করেন যেখানে জ্যোতির্বিদ হিসেবে তিনি শিক্ষা ও সেবা দান করেন ৷ দর্শন,আইন,ইতিহাস,গণিত,চিকিৎসা এবং জ্যোতির্বিদ্যা বিভিন্ন বিষয় আয়ত্ত করেছিলেন এই প্রতিভাবান ব্যক্তি ৷

ওমর খৈয়াম পাশ্চাত্যে খ্যাতি পেয়েছেন তার উপর আরোপিত সংকলিত "রুবাইয়াৎ" অথবা "চতুষ্পদী কবিতা" র মাধমে৷ (চতুষ্পদী কবিতা হল চার লাইনের পংক্তিসম্পন্ন যেখানে ছন্দবিন্যাস প্রধানত কককক অথবা ককখক ;এটি আধাত্নিক জ্ঞানে বিশেষ ছন্দবদ্ধ )
ওমরের কবিতার আবেদন তুলনামূলকভাবে কম আকৃষ্ট করেছিল যতক্ষন না পর্যন্ত তারা ফিটজেরাল্ড গ্রন্থিত"রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম" এর নতুন জনপ্রিয় বাক্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত না হয়  ৷ যেমন,

"এক পেয়ালা মদ,এক টুকরো রুটি এবং তুমি"
"নগদ যা পাও হাত পেতে নাও"এবং
"ফুল ফোটে হঠাৎ নিত্য মরার তরে  "

এই চতুষ্পদী কবিতাগুলো প্রায় সকল প্রধান প্রধান ভাষায় অনুদিত হয়েছে এবং পারস্য সম্বন্ধে ইউরোপবাসীদের ধারণাকে অতিরঞ্জিত করার জন্য ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে ৷কিছু পন্ডিত ওমরের কবিতা লেখা প্রসঙ্গে সন্দিহান ৷ তার সমসাময়িকরা তার কবিতার কোন আলামত পান নি এবং  মৃত্যর দুই শতাব্দীর পরে তার নামযুক্ত কিছু কবিতা না পাওয়া পর্যন্ত ৷
পরবর্তীতে কখনো কবিতাগুলোকে বিশেষ মতামতের বিরুদ্ধে উদ্ধৃতি হিসেবে অধিক ব্যবহৃত হতে দেখা যায় বাহ্যত ওমরের নামে,শীর্ষস্থানীয়  কিছু পন্ডিত সন্দেহপোষণ করেন যে তারা ওমরকে আবিষ্কার ও আরোপিত করে থাকতে পারে তার পান্ডিত্বসুলভ খ্যাতির জন্য ৷

ওমরের প্রত্যেকটি চতুষ্পদীই এক একটি পূর্ণ কবিতা ৷ইনি ফিটজেরাল্ড যিনি ধারনা পোষণ করেছিলেন রুবাইয়াতগুলোকে একত্র করে ক্রমগাঁথা তৈরিতে যেগুলোতে আধ্যাত্মিক ঐক্য ও সমন্বয় ছিল ৷ ফিটজেরাল্ডের  প্রতিভা এবং নিটোল শব্দচয়ন তার অনুবাদকে কালান্তরিত প্রাঞ্জলতা ও তেজদীপ্ত করেছে ৷ তারা,এতদসত্ত্বেও,এই চতুষ্পদীগুলোর অধিক ভাবানুবাদ এবং অতিসম্প্রতি এর অনেক বিশ্বাসযোগ্য অনুদিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ৷

ফিটজেরাল্ডের ও অন্যান্যদের অনুদিত পঙ্কতি মানুষের অন্তর্দৃষ্টিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে—দ্বারস্থ করেছে বাস্তব-প্রকৃতি ও চিরন্তনতা, অনিশ্চিত ও নশ্বর জীবন,মানব-বন্ধনের স্বর্গীয়রূপ  ও পারলৌকিকতা,আচারসর্বস্ব ধর্মের স্থায়ীত্ব,এবং নশ্বর মানবের প্রখর-অনুভব ও অজ্ঞতা সমন্ধীয় প্রশ্নের ৷ তার মস্তিকে জটিল এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর মেলেনি,তাই তার ধর্মবিশ্বাসভিন্ন পার্থিব জগতকেই তিনি ক্ষণিক ও ইন্দ্রীয় সৌন্দর্যের রস উপভোগের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন ৷
তিনি নির্মোহ পরিতুষ্টির নির্মল প্রশস্তি রচনা করেছেন ৷ এতদসত্ত্বেও তিনি মৌলিক আধ্যাত্মিক প্রশ্নে তার সততা ও একাগ্র অনুধ্যান বিসর্জন দেন নি ৷
   

শনিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

রেজাউল করিম রনিঃগোলাপ সন্ত্রাস—রায়ান নূর

"গোলাপ সন্ত্রাস" নামটা শুনলেই কেমন একটা প্রশ্ন দানা বাঁধে মনে ৷ স্বপ্ন নয় সত্যি এটা একটা কাব্যগ্রন্থ ৷ কবি রেজাউল করিম রনি রচিত এই কাব্যে মোট আটান্নটি কবিতা আছে বিভিন্ন সাধের ৷ সকলেই কবিতার বিভিন্ন রস উপভোগ করেছেন কিন্তু এই কাব্যের রস স্বতন্ত্র এবং আলাদা ছাঁচে তৈরি পাঠকগন না পড়লে হয়ত বুঝবেন না ৷ সমালোচনার খাতিরে নয় বরং আলোচনার তাগিদে ৷ শব্দের অপভ্রংশও কতটা সুখকর তার নিদর্শন এই কবিতাগুলি ৷কাব্যের অনেক কবিতায় নজর বুলিয়েছি যা কিছুটা মন কাড়ার মত ৷

আসমান ধরে টানাটানি করে
পাটখড়ির শাশুড়ি,মিহি সাপ তোলে ফুঁস-ফনা ৷
আবার,

আকাশের চেয়ে অনেক বিরাট আকাশ
—এই রিদয়ের মনোভূমি ৷
ঘাসের বুকে পৃথিবী হয়ে—জীবন
মুছে দেয় চাঁদের কলঙ্কজমি ৷

এমনই আরো অনেক কবিতা নজর কাড়ার মত ৷ পাঠক সংখ্যা সে বিবেচনায় আলোচনার বাইরে ৷ দ্বিতীয় দশকে এ যেন আরেক নতুন সংস্করণ ৷ কবিতার ভাবগুলো মহাকাব্যের ঢং এ স্বর্গ মর্তও পাতাল ব্যাপি বিচরণ করছে ৷গ্রাম্য নষ্টালজিয়া অনুভূতিগুলো নতুন সুরে জাগ্রত করে এই কবিতা গুলো

সূর্য ওঠে প্রতিদিন,বাঁশবাগানের আঁড়ে,কড়ুই গাছের ফাঁকে
বরিল বিলের বাঁকের বাতর ঘেষে
সূর্য ওঠে আমাদের বাঁশঝাড়ের বকের বাসায় পাশ ঘেঁষে ৷

কবিতাপ্রেমীদের কাছে এই কাব্য চোখ ধাধানো রঙে আবির্ভূত হবে ৷ বইটি পাওয়া যাচ্ছে একুশে বইমেলার "আদর্শ "স্টলে ৷ মূল্য—150 টাকা ৷
 

শুক্রবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

জগলুল হায়দারঃ হাউ মেনি পেডি টু হাউ মেনি রাইস—রায়ান নূর

বাংলাদেশের ছড়ার যাদুকর ও বিজ্ঞান ছড়ার জনক জগলুল হায়দারের সমকালীন একটি ছড়ার বই আজ প্রকাশ হয়েছে যার নাম"হাউ মেনি পেডি টু হাউ মেনি রাইস'। এটি আমাদের লোক সমাজে প্রচলিত একটি বাক্যবন্ধ যার বাংলা ভাষান্তর করলে দাঁড়ায় "কত ধানে কত চাল"৷ বইটা বইমেলায় আসার আগেই আমার হাতে এসেছে তাই অনুভূতিটা একটু অন্যরকম অর্থাৎ এই বইয়ের প্রথম পাঠক আমি ৷এই বইয়ের অন্তর্ভুক্ত ছড়া গুলো হচ্ছে;←দলীয়করণ←ছাগলশুমারী←ফেল←জোড়াতালির রাশিফল←হাউ মেনি পেডি টু হাউ মেনি রাইস←আমার সোনার বাংলা←দৌড়←খবরদারী←নিয়মের ব্যাকরণ←সর্বদল←টক টক টক্কর←বুনো মুনো←জিনিস←গদির গান←পাওয়ার←বাংলা ছাড়ো←থ্রিজি←সময়ের ধ্বনি← চাপা←সূর্য যদি←আর করো না←হিসাব করে←পূর্বপশ্চিম←ফাল মারে←ধ্বস←ঘুরে ফিরে←সাটেলাইট অপঃকালচার←রোদ হেসেছে←থামান←তিন পথ←শেষমেষ←নাভিশ্বাস←সুন্দরবন সুন্দর বোন←রাজশিশু←জ্যাম←হচ্ছে কি সব←লানৎ←নিষ্ফলা সহ চল্লিশটি ছড়া রয়েছে ৷ জগলুল হায়দার এর ছড়া মানেই ধুন্ধুমার কাণ্ড। এক আশ্চর্য আকর্ষণ। তাই সব কয়টি ছড়া একরাতেই পড়ে শেষ করেছি ৷ সবগুলো ছড়া একেক রকম ভাব ভঙ্গিমায় এক কথায় অসাধারণ ৷ একবার পড়লেই তার তাল মনে যেন নিমিষে গেঁথে যায় ৷ তার কয়েকটি লাইন যেমন—

স্যাট চ্যানেলে প্যাট দেখা যায়
কাজল জুহি আলিশার
সবই চলে রসাতলে
টিভি দেখাই খালি সার!

আবার,

মন্ত্রী ডেকে রাজা হাঁকেন
নোটিশ দিয়ে বলিও—
এখন থেকে প্রশাসনে
সবাই হবেন দলীয় ৷

টার্মিনাল আর হলের পর
দখল হবে গলিও
দলের নামেই চাঁদ উঠবে
ফুটবে ফুলের কলিও ৷

পাঠকদের আরেকটি সুখবর যেটা হল,বিখ্যাত ছাগলশুমারী ছড়াটাও এই বইয়ে থাকছে ৷ বইটি যদি কেউ না পড়েন তবে অনেক মিস করবেন এক আশ্চর্যকর অনুভূতি থেকে কেননা এটি এবারের মেলার ব্যতিক্রমধর্মী ছড়ার বই ৷বইটি প্রকাশ করেছে "উদাহরণ প্রকাশন"৷ বইটি পাওয়া যাবে একুশে বইমেলায় অঙ্কুর প্রকাশনীর স্টলে (৩১১-৩১৩) ৷মূল্যঃ100 টাকা

শুক্রবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

কবি মনসুর আজিজঃজীবনের খেরোখাতা(অতলান্ত নীল চোখ)—রায়ান নূর

কবি মনসুর আজিজ সাম্প্রতিক কালে খুব সুন্দর কবিতা লেখেন ৷ তার কবিতার প্রধান অলঙ্কার উপমা ও চিত্রকল্প ৷ তার একটি কবিতা আমার নজর কেড়েছে হঠাৎ 'জীবনের খেরোখাতা'৷ এই কবিতাটি "অতলান্ত নীল চোখ(2002)" শীর্ষক কবিতাগ্রন্থের প্রথম কবিতা ৷কবিতাটি আমার কাছে মনে হয়েছে হঠাৎ বিশেষ থেকে সামান্যে প্রত্যাবর্তন ৷ কবিতাটিতে কত গুলো উপমা প্রয়োগ হয়েছে যেগুলো সাহিত্যে নতুন ৷ পাঠকের কাছে হয়ত কবিতাটির ভাবার্থ অন্যভাবে ধরা দিবে কিন্তু তার সমালোচনা করলে তাকে তুচ্ছ বলা হবে না ৷"নীল অতলান্ত চোখ" এর একটি চোখ অন্তত এখানে দাড়াতে বাধ্য ৷ কয়েকটি উপমা,প্রতীক লক্ষ্য করা যাক—

হিংস্র নখর—নখরের(নখ) ন্যায় হিংস্র ৷
হৃদয় নহর—নহরের মত বহমান হৃদয় ৷
হিংসা বহর—হিংসা বহনকারী বাহনসমষ্টি ৷
শান্ত দুপুর—দুপুরের ন্যায় শান্ত যে ছবি ৷
ঘাসকুঁড়ি—কুঁড়ির ন্যায় প্রস্ফুটিত ঘাস ৷
খেরোখাতা—খেরুয়া কাপড়(লাল বর্ণের সুতা) দ্বারা মোড়া খাতা (দীনবন্ধু মিত্র কর্তৃক ব্যবহৃত শব্দ)

এই উপমাগুলো একবারে নতুন ৷ শব্দ ব্যবহারে কবির দক্ষতা রয়েছে ৷ কিন্তু তা কতটা প্রাসঙ্গিক তা আলোচ্য বিষয় হতে পারে ৷ কবির জীবনের ইতিবৃত্ত খানিকটা ফুটে ওঠেছে এই কবিতায় ৷ বিদেশী কতগুলো শব্দ কবি আত্নগত করেছেন নিপূনভাবে যেমন— নহর;মনজিল;জানোয়ার;ফার্নেস ৷

আলোচনায় আসা যাক প্রথম চার পঙ্কতিঃ


এলোমেলো হল আজ জীবনের খেরোখাতা
ঢেউ ভাঙে তীর ভাঙে জীবনের স্মৃতি ভেঙে বহু ভাজ
নরম ঘাসের পরে হেটে যায় হিংস্র জানোয়ার
ঘাসকুঁড়ি কেঁপে ওঠে কেঁদে ওঠে কাঁপিয়ে ভুবন ৷

কবির অবসাদ গ্রস্তের একটি দারুন চিত্রকল্প ৷ জীবনের খেরোখাতা এলোমেলো হয়ে কবির স্মৃতির তীর ভেঙে করেছে খন্ডিত ৷আর এর পেছনে কবি কারণ নির্দেশ করেছেন তার সমতল,বহমান স্থিতিস্থাপক জীবনে হিংস্র জানোয়ারের ন্যায় কতিপয় মানুষ হেঁটে চলে তার স্বপ্নগুলোকে বাধাগ্রস্ত করেছে ৷ এই লাইনগুলোতে যতিচিহ্নের প্রতি কবির অনীহা পরিলক্ষিত হয়েছে ৷ এখানে যতিচিহ্ন প্রয়োগ হত দ্বিতীয় ও চতুর্থ লাইনে যা কবির ইচ্ছাকৃত অথবা অনাকাঙ্খিত ভুল সিদ্ধান্ত ৷ আবার কবির একটি বাক্য
"ঢেউ ভাঙে তীর ভাঙে জীবনের স্মৃতি ভেঙে বহু ভাজ"৷ 
ঢেউ ভাঙে শব্দটা প্রায়োগিক দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ কেননা ঢেউ ভাঙতে পারে না কিন্তু তীর ভাঙতে পারে ৷ ঢেউ যদিও ভাঙে তা জলাশয় হবে এবং স্থবির হবে আর তাকে ঢেউ বলা যাবে না যা তীর ভাঙতে অক্ষম ৷ আবার স্মৃতি মুছে যেতে পারে,বিবর্ণ হতে পারে কিন্তু ভাঙতে পারে না ৷ আর যদিও ভাঙে তার ভাঁজ হয় না ৷ শব্দ প্রয়োগের দিক থেকে লাইনটি অর্থহীন ৷স্মৃতি ভিসিডি ডিস্কের মত ভাঙলে পুরো কবিতা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে ৷

দ্বিতীয় স্তবকে


ঢেউ ভাঙে জল ভাঙে ভেঙে চলে জীবনের শান্তপুকুর
পাতা নড়ে পাতা ঝরে নড়ে ওঠে শান্তদুপুর
দেহ জুড়ে বয়ে যায় ঝড়ের কাঁপন
খেরোখাতা ছিড়ে যে ছিল আপন ৷

এই স্তবকের সারাংশ এই, স্থবির জীবনের আশাগুলো খন্ড খন্ড ভাঙনে যাত্রা শুরু করার পর মধ্যাহ্নে তার স্বপ্নগুলো ঝরে পড়তে শুরু করে আর সেগুলো তার কোন আপনজনের চক্রান্তে ৷ 
কবি আবারও প্রথম বাক্যে একই ভুল করেছেন নিছক চিত্রকল্পের খাতিরে যা অবান্তর ৷ জল ভাঙে এবং ভাঙতে পারে আর শান্ত পুকুর গতিময়তা পেতে পারে কিন্তু ঢেউ ভাঙতে পারে না বরং হারাতে পারে ৷ এখানেও প্রথম ও দ্বিতীয় লাইনে যতিবিভ্রম ঘটেছে যা পাঠকের কাছে কাম্য নয় ৷

তৃতীয় স্তবকে


হিংস্র নখর কতো ছিঁড়ে ফেলে হৃদয় নহর
দুপুরের ঝলকানি ঢেলে দেয় হিংসা বহর
দয়িতার স্বপনের চূড়া ভেঙে মনজিল শেষ
পিদিমেরা কেঁদে ওঠে হায় ফার্নেস ৷

এই স্তবকের সারাংশ এই,  জীবন মধ্যাহ্নে হিংসুক হিংস্র পশুর নখের আঘাতে তার হৃদয়ের স্বপ্নের মঞ্জিল ছিন্ন ভিন্ন আর তাই ছোট আশা গুলো পুনরুজ্জীবনের কাছে বিলাপ করে ৷ এই সারাংশ যে স্তবকে ফুটে ওঠেছে তা যে কবির কৃতিত্ব তার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন কিনা তা আলোচ্য বিষয় ৷
হৃদয় নহর ছিঁড়ে ফেলা সম্ভব নয় কেননা এটা খেরোখাতা নয় ৷ হৃদয় নহর বিদ্ধ হয়,জ্বলতে পারে,আন্দোলিত হতে পারে,ফেটে যেতে পারে,ভাগ হতে পারে কিন্তু ছিড়তে পারে না ৷ আবার কবি নিজের একান্তে কবিতা শুরু করলেও এখানে এসে প্রয়োগ করেছেন বহুজনের কাছে ৷ তার প্রথম প্রমাণ প্রথম লাইনে 'কতো'  শব্দে পাঠকের কাছে তা উন্মোচিত হয়েছে ৷ আবার দুপুরের ঝলকানি বলতে পুনরুজ্জীবনকে নির্দেশ করেছেন কিন্তু এমনভাবে প্রয়োগ করছেন যেন কবি নিজেই অন্যকে হিংসা করছেন ৷ তার প্রমাণ তৃতীয় লাইনে দয়িতা(নারী) শব্দে উন্মোচিত হয়েছে ৷ এখানে একজন নারী হিসেবেও কবি আত্নপ্রকাশ করেছেন আবার শত্রু হিসেবেও আত্নপ্রকাশ করেছেন যা বিরোধাভাস ৷ কবি এখানে ইঙ্গিত সূচক কোন বাক্য ব্যবহার করেন নি অস্পষ্টতা দুর করার জন্য ৷ দুপুরের ঝলকানিকে যদি ব্যক্তি হিসেবে স্বীকার করি তবে প্রথম লাইনটি অর্থহীন মনে হয় ৷ চতুর্থ লাইনে পিদিমেরা শব্দটি বহুবচন করে সংহত একটা ভাবকে আবারও বিতর্কিত করেছেন ৷চিত্রকল্পের খাতিরে পাঠকের কাছে সুক্ষ বিষয় অনুভূত হওয়ার কথা ন়য় বরং আবেগটা প্রাধান্য দিয়েছেন কবি ৷ এটা কবির নারীরূপ কল্পনা যা দয়িতা শব্দে দৃষ্টিগোচর হয়েছে ৷

চতুর্থ স্তবকেঃ


হুকা থেকে উড়ে আসে নিঃশেষ ধোঁয়া
হায় কেন সাধ হল খেরোখাতা ছোঁয়া

দুই লাইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ হল হুকার ধোঁয়া নিঃশেয় হয়েছে অর্থাৎ জীবনের সায়াহ্নে আগমন আর কবির ভুল যে অন্যের খেরোখাতা ছুয়েঁ ফেলা ৷

'জীবনের খেরোখাতা' যে শুধু কবির একার খাতা নয় তার সাথে জড়িয়ে আছে মলাটবন্দী আরেক খাতা ৷ পরস্পর বিরোধের কারণে দুইজনই যে নিভু নিভু অর্থাৎ সংসারে আবদ্ধ তা পরস্পর বিরোধী ভাষ্যে উন্মোচিত হয়েছে ৷ একজন ছিঁড়ে ফেলে যন্ত্রনা দিয়েছে আর একজন ছুঁয়ে যন্ত্রনা পেয়েছে ৷ কবি হয়ত কল্পনা করতে পারেন নি  যে তিনি নিজেই শত্রুবেশে সংসারধর্মে নায়ক ৷ কবিতার ভাবগত দিকটা সম্পূর্ণ নতুন এর আগে এ রকম কবিতা লিখিত হয় নি ৷ মানুবজীবনের অগ্রযাত্রায় সংসার যে উপযাচক তাই কবির ভাষ্য ছিল এই কবিতায় ৷